৪ বছরের কোর্স ৩ বছরে: শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে যশোরে সাংবাদ সম্মেল

নিউজটি শেয়ার লাইক দিন

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড পরিচালিত ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স প্রতি সেমিস্টারে ১৬ সপ্তাহ হিসেবে ৯৬ কার্যদিবস ক্লাস গ্রহণের বিধান থাকলেও কোভিড-১৯ এর কারণে পিছিয়ে থাকা সেমিস্টার সমন্বয়ের নামে কমিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে ৪ বছরের পরিবর্তে ৩ বছর অর্থাৎ ১৬ সপ্তাহের পরিবর্তে ১২ সপ্তাহে শেষ করা হচ্ছে।

তাছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও ব্যর্থ হয়েছেন ও রাতের আঁধারে ইনস্ট্রাক্টর পদে নন টেকনিক্যাল ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে এই শিক্ষাকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করা হচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।

১৩ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘যে পড়া তিন বছরে পড়ানো সম্ভব তা টেনে হিচড়ে চার বছরে নিয়ে বাবা-মায়ের বাড়তি খরচ করানো হয়। বিশ্বের অনেক জায়গায় যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা অনেক উন্নত। সেখানে অনার্স কোর্সও আছে তিন বছরের। সারা বিশ্বে কারিগরি শিক্ষায় যে মান অর্জিত হয়, আমরা আমাদের কারিগরি শিক্ষায় সে মান নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। সে মান নিয়ে আসার পাশাপাশি এখাতকে আরও প্রশস্ত করা দরকার। তাই আমরা মনে করি,ডিপ্লোমা কোর্স তিন বছর হওয়া উচিত।’

এসব ব্যর্থতা ঢাকতে কিংবা অন্য কোন গোষ্ঠি বা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার তাড়না থেকে কি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এ ধরনের আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে পা বাড়াচ্ছেন, সেটি জাতির কাছে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে সংবাদ সম্মেলন দাবি করা হয়।

শিক্ষামন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রেসক্লাব যশোর কনফারেন্স রুমে এক সংবাদ সম্মেলন করেন বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র শিক্ষক পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আহ্বায় রুহুল আমিন লিখিত বক্তব্য পাঠ করে জানান, শুধুমাত্র ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাব্যবস্থা নয়, নানান মহল থেকে সামগ্রিক শিক্ষার মান নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেই ব্যর্থতার দায় ঢাকতেই অত্যন্ত সুকৌশলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার মেয়াদ হ্রাসের ইস্যু জাতির সামনে এনেছেন। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রতিটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। শিক্ষার্থীদের মাঝে যে ক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে সেটি ক্রমেই অগ্নিগর্ভে পরিণত হবে। যা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত ১৭-২৫ আগস্ট ২০২২ পর্যন্ত আমরা জেলা শাখার উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। এই সংবাদ সম্মেলন থেকে দেশের ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষায় আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি
হস্তক্ষেপ কামনা করছি। দেশের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদেরকে উন্নয়ন কর্মকান্ডে নিয়োজিত থেকে দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সকল প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত পেশাগত সমস্যা সমাধানে ৪ দফা দাবি বাস্তবায়নে বিনীত অনুরোধ জানানো হয়।

আরো জানানো হয় বিভিন্ন টেকনোলজিতে আধুনিক ডিপ্লোমা-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষার্থীগণ বৈশ্বিক কর্মবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাসহ দেশের উন্নয়ন উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছেন।
৪র্থ শিল্প বিপ্লব ও আগামীর কর্মচ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিক্ষার মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে এ শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তির হার ২০৩০সালে ৩০% এবং ২০৪০ সালে ৫০% এ উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছেন।

 

ঠিক সেই মুহূর্তে শিক্ষামন্ত্রীর এ ধরনের দায়িত্ব জ্ঞানহীন বক্তব্য পুরো ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা কোর্সকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। আমরা আশংকা করছি-শিক্ষামন্ত্রীর এ ধরনের দায়িত্বহীন বক্তব্যের ফলে এই শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন ও শিক্ষার্থী ভর্তির হার আরো নিম্নমুখী হবে। সরকারের পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে। কেননা, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা কোর্স ৩ বছর করা হলে-এ শিক্ষার প্রতি মেধাবী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কর্মক্ষেত্রে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারগণ অবমূল্যায়িত হবেন।

আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি, কমিউনিকেশন স্কিল সহ নানা বিষয়ে ঘাটতি থাকার কারণে ৩ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স উত্তীর্ণ প্রকৌশলীগণ মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবমূল্যায়িত হওয়ার শংকা সৃষ্টি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ হ্রাস পাবে। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের যোগ্যতা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। ডিগ্রি ও  ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের সাথে এডুকেশনে পার্থক্য ২ বছর হওয়ায় চাকরির একধাপ নিচে বেতন ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে, মর্যাদা হারাবে। আন্তর্জাতিক জব মার্কেটে পূর্বের ন্যায় বেতন ও মর্যাদা হারাবেন, তাতে দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্র বাঁধাগ্রস্ত হবে।

দেশের আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প কারখানায় নিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং উদ্যোক্তাদের মোটা অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশী জনবল নিয়োগ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ভয়াবহ শিক্ষক স্বল্পতা দূরীকরণে ইতোমধ্যে সাড়ে ১২ হাজার শিক্ষকের পদ সৃজন করেছেন। ল্যাব/ ওয়ার্কসপ, ক্লাসরুম সংকট নিরসনে ৩ বছর পূর্বে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু বিগত ৩ বছরেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় ঘোষণা অনুযায়ী
শিক্ষক স্বল্পতা, ল্যাব/ওয়ার্কসপ, ক্লাসরুম সংকট নিরসনসহ কোন সমস্যাই সমাধান করতে পারে নাই। বর্তমানে ৫১:১ অনুপাতে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে সকল নির্দেশনা শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে-

উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে একটি করে কারিগরি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালে এসেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে নি। ২০২৩ সালেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে কিনা, সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থার বিশেষজ্ঞদের মাঝে শংকা দেখা দিয়েছে। দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহে তীব্র শিক্ষক সংকট, ল্যাব, শ্রেণিকক্ষ ও ওয়ার্কসপ প্রকট স্বল্পতার কারণে মানসম্পন্ন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই শিক্ষক সংকট নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সাড়ে ১২ হাজার শিক্ষকের পদ সৃজন করা হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে উদাসীন।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একটি মিমাংসিত কোর্স সম্পর্কে বিতর্কিত ও তির্যকপূর্ণ বক্তব্য পুরো ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাব্যবস্থা ও জাতীয় প্রকৌশল কর্মপরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন,বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র শিক্ষক পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব তরিকুল ইসলাম, আহবায়ক রুহুল আমিন সহ আরো অনেকে।

Comments (0)

Your email address will not be published. Required fields are marked *