টিসিবির আমদানী ৫৫, ব্যবসায়ীর ১৪ টাকা মূল্যে, রহস্যটা কি !

নিউজটি শেয়ার লাইক দিন

আব্দুল্লাহ আল মামুনকে সঙ্গে নিয়ে তরিকুল ইসলাম মিঠুর প্রতিবেদন: নৃত্যপণ্য প্রয়োজনীয় পেঁয়াজ, রসুন ও আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে দেশে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে গত কয়েকদিন ধরে দেশে শাকসবজি সহ অন্যান্য পন্যের ও দাম বৃদ্ধি পেয়েছে বহু গুনে। দেশের পেঁয়াজের বাজার মোকাবেলা করতে এরই মধ্যে বেসরকারী পর্যায়ে পেঁয়াজ আমদানী করা হচ্ছে। তবে গত শুক্রবারে ভারত থেকে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ২০১ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানী করেছেন। পণ্যটি ভারত থেকে ক্রয় মূল্য দেখানো হয়েছে ২২০ ইউএস ডলার। যার বাংলাদেশী মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪৯ টাকা । কিন্তু বেসরকারি পর্যায়ে আমদানিকারকরা একই ধরনের পেঁয়াজ আমদানী করেছে ১৪০ থেকে ১৬০ ডলারের মধ্যে। সরকার ও বেসরকারি পর্যায়ে পেঁয়াজের এই আমদানী দর ফারাক নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।

তবে সংশ্লিষ্ট ট্রেডিং কর্পোরেশন অফ বাংলাদেশ (টিসিবি) দাবি করেছেন তারা এনএস কনস্ট্রাকশন নামে একটা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে পেঁয়াজ আমদানীর দায়িত্ব দিয়েছেন। তারাই মূলত তিন হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানী করবে ভারত থেকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার সৌরভ দাবি করেছে তারা আমদানি করছে না। তারা শুধু এসব মালামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট করছে।

প্রতিষ্ঠানটি গত শুক্রবারে ইতিমধ্য বেনাপোল বন্দর দিয়ে ২০১.৫৯ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানী করেছে। যার আমদানী মূল্য দেখানো হয়েছে সর্বসাকুল্যে ৪৪৮ ইউএস ডলার। সেই হিসেবে প্রতি কেজি পিঁয়াজের মূল্য পড়ে ৪৯.৪৮ টাকা। কাস্টমসের ভ্যাট ট্যাক্স সহ প্রতি কেজি আমদানী খরচ পড়ে ৫৩ টাকা ৪৮ পয়সা। এসব পিঁয়াজের মোট মূল্য ৯০ হাজার ৩১২ ইউএস ডলার।

অথচ একই পেঁয়াজ সাধারণ ব্যবসায়ীরা বেনাপোল বন্দর দিয়ে চলতি মাসেই ভারত থেকে আমদানী করেছে ২৭৮ মেট্রিক টন। এসব পেঁয়াজের ইনভয়েস ভ্যালু দেখানো হয়েছে ১৪০ থেকে ২২০ ইউএস ডলার। সেই অনুযায়ী ভারত থেকে এ সব পেঁয়াজ ক্রয় করা ১৪ টাকা ২৯ পয়সা থেকে ২৪ টাকা করে। সব মিলিয়ে কাস্টমসের অ্যাসেসমেন্ট ধরা হয়েছে ৩৩০ ডলার। কাস্টমসের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালুসহ আমদানীকৃত এসব পিঁয়াজের দাম দাঁড়ায় ১৮ থেকে ২৪ টাকায়। এসব মালের ক্লিয়ারেন্স করেছে বেনাপোলের ৫ সিএন্ডএফ এজেন্ট। যার ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে ১৪০ ইউ এস ডলার। সেই হিসাবে প্রতি কেজি পেঁয়াজের ক্রয় মূল্য পড়ে ১৪.২৯ টাকা।

 

তবে আড়তদারদের দাবি আমদানিকারক ও সংরক্ষণকারীরা সিন্ডিকেট করেই অতি মুনাফার লোভের আশায় এ সংকট তৈরি করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে পণ্যটির দাম কমানো সম্ভব।

যশোর বড় বাজারের আড়তদার বাদশা মিয়া বলেন, মঙ্গলবার সকালে তারা ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে পাইকারিতে পিঁয়াজ বিক্রি করেছে। এরমধ্যে ইন্ডিয়ান পিঁয়াজ ৬০ টাকা ও দেশী পিঁয়াজ বিক্রি করেছে ৭০ টাকা। তার দাবি আমদানিকাররা সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজের বাজার অস্থির করে রেখেছে। সরকার যদি দাম বাড়ার গোড়া খুঁজে অভিযানে নামে তাহলে নিশ্চয়ই পেঁয়াজের দাম কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

বেনাপোলের সিএন্ডএফ এজেন্ট শোভা এন্টারপ্রাইজের মালিক নাবিল হোসাইন বলেন, আমদানীকৃত পেঁয়াজের ইনভয়েস মূল্য মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হলো কাস্টমসের এসেসমেন্ট মূল্য ও ইন্ডিয়ান কাস্টমসের ইনভয়েস মূল্যের উপর রপ্তানী শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া। দু’দেশের সরকারী পর্যায়ে আলাপ আলোচনা করে ভারতে রপ্তানী শুল্ক উঠিয়ে নিলে পেঁয়াজের দাম অনেক অংশ কমানো সম্ভাব।

বিষয়টি নিয়ে পেঁয়াজের আমদানীকারক প্রতিষ্ঠান এনএস কনস্ট্রাকশনের ম্যানেজার সৌরভের মুঠোফোন সংযোগ দিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমাদের ব্যবসায়িক বিষয়। এটা আপনি জেনে কি করবেন। জানতে হলে আপনি রাতে আমার সঙ্গে দেখা করেন। বিষয়টি আপনাকে বুঝিয়ে বলবো।

বেনাপোল এক নম্বর শুলকায়ন গ্রুপের রাজস্ব কর্মকর্তা রেজাউল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বেনাপোল দিয়ে গত এক মাসে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টনের অধিক পেঁয়াজ আমদানী করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে শুধুমাত্র টিসিবির ইনভয়েস ভ্যালু ছিল ৪৪৮ ইউএস ডলার। আর ব্যবসায়ীদের ইনভয়েস ভ্যালু ছিল ১৪০ থেকে ১৬০ ডলারের মধ্যে। এসব পেঁয়াজের ক্রয় মূল্য ১৪ টাকা থেকে ২৪ টাকা পর্যন্ত। তবে টিসিবির আমদানিকৃত পেঁয়াজের মূল্য পড়ে ৫৩ টাকার অধিক। এসব বিষয় নিয়ে আমরা অনেক সময় বিস্মিত হয়ে যায়।

সরকারীও বেসরকারি পর্যায়ে পেঁয়াজ আমদানীতে দরের বিস্তার ফারাকের বিষয় জানতে চেয়ে টিসিবির কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের মুঠোফোনের সংযোগ দিয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে এনএস কনস্ট্রাকশন নামে একটা প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩০০০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানী করতে দিয়েছি। তাই বিষয়টা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে টিসিবির নামে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানীর বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের নামেই পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে। পেঁয়াজের দরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তার ফোনটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বিষয়টি নিয়ে ট্রেডিং কর্পোরেশন অফ বাংলাদেশ (টিসিবি) চেয়ারম্যান বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আরিফুল হাসানের মুঠোফোনের সংযোগ দিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইন্ডিয়াতে পেঁয়াজের দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। এরপরে ট্রান্সপোর্ট, কাস্টম, এক্সপোর্ট খরচ সহ দাম অনেক বেশি। যে কারণে আমদানী করে কম রেটে পেঁয়াজ দেয়া সম্ভব না। আমরা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটিকে ৪৪৮ ডলার ও ৪৫০ ডলার রেট দিয়েছি। ভারত থেকে আমদানি ক্ষেত্রে এবং পাকিস্তানি থেকে আমদানীর ক্ষেত্রে ৪৫৭ ডলার রেট দিয়েছে। এর নিচে কেউ দিতে পারবে না। টেন্ডারের সময়ে অনেক জায়গা থেকে অনেক লোক এসেছে। অনেকে কমে দিতে চেয়েছে কিন্তু পরে ভেগে গেছে।

Comments (0)

Your email address will not be published. Required fields are marked *