মোবাইল কোর্ট কর্তৃক ব্যবসায়ীদের নির্যাতনের খবর প্রকাশের জেরে সাংবাদিক লাঞ্ছিত

নিউজটি শেয়ার লাইক দিন

নড়াইল প্রতিনিধি ঃ গত ১০ দিন ধরে নড়াইলের মোবাইল কোর্টের টার্গেটে পরিনত হয়েছে গনমাধ্যম কর্মীরা। নড়াইল প্রেস ক্লাবের সভাপতি, টেলিভিশন সাংবাদিক, পত্রিকার সম্পাদক, রিপোটার্স ইউনিটিও বাদ যাচ্ছে না। জরিমানাও গুনতে হয়েছে কয়েকজন সংবাদকর্মীকে। করোনাকালিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ছবি তুলতে বাধা দিয়ে সেসব ভিডিও সাংবাদিকদের কাছ থেকে ক্যামেরা নিয়ে মুছে ফেলতে বাধ্য করা হচ্ছে। আর এই অবস্থা তৈরী হয়েছে পত্রিকায় মোবাইল কোর্টের হাতে মার খাওয়া ব্যবসায়ীদের প্রতিবেদন করার পর থেকে। এ নিয়ে জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

গত ১৩ মে সন্ধ্যায় একুশে টিভির জেলা প্রতিনিধি ফরহাদ হোসেন এবং বনিকবার্তা’র জেলা প্রতিনিধি ও নড়াইল প্রতিদিন এর প্রকাশক মোঃ ইমরান হোসেন রূপগঞ্জ এলাকায় বাজারের খবর সংগ্রহে যান। মুচিপোল এলাকায় মোবাইল কোর্টের দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিষ্ট্রেট মো. জাহিদ হাসান হেলমেট নেই এই অপরাধে ওই দুইজন সাংবাদিককে ৫শ’ টাকা জরিমানা করেন।

সাংবাদিক ইমরানের বক্তব্য, ইফতারির ১৫ মিনিট আগে আধাঘন্টা দাড় করিয়ে ভ্রাম্যমান আদালতের কারনে সময়মতো ইফতার করা সম্ভব হয়নি। ভ্রাম্যমান আদালতের নামে এটি একটি অমানবিক ব্যাপার।

১১ মে সদর হাসপাতাল এলাকায় মোবাইল কোর্টের ছবি তুলে ম্যাজিষ্ট্রেট মো. জাহিদ হাসান এর কাছে হেনস্থা হন বিটিভির ক্যামেরায় কাজ করা শুভ সরকার। কেন ভ্রাম্যমান আদালতের ছবি তোলা হলো, এই অভিযোগে তার ক্যামেরায় থাকা ছবি পুলিশ দিয়ে মুছে দেন ওই কর্মকর্তা।
শুভ সরকারের অভিযোগ, ভ্রাম্যমান আদালত মুখ চিনে মোটর সাইকেল আটকাচ্ছিলেন। পরিচিত হলে তাদের ছেড়ে দিচ্ছিলেন সেই ছবি ধারণ করায় আমার ক্যামেরার ছবি জোর করে মুছে দিয়েছেন। একই রকমভাবে ভ্রাম্যমান আদালতের ছবি তোলায় দৈনিক অনির্বান এর জেলা প্রতিনিধি মিলন বিশ্বাসকে পুলিশের মাধ্যমে হেনস্থা করে ছবি মুছে দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

১০ মে দুপুরে রূপগঞ্জ চৌরাস্তায় ওয়ালটন মোড়ে ভ্রাম্যমান আদালত স্থানীয় দৈনিক বিডি খবর এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এড. রাজীব এর মোটর সাইকেলসহ তাকে ৫শ’ টাকা জরিমানা করলে সেই টাকা পকেটে না থাকায় আরেক সাংবাদিক এস কে সুজয় দিয়ে পাঠালে তাকেও জরিমানা দিতে বলেন ওই ম্যাজিষ্ট্রেট। এসময় ম্যাজিষ্ট্রেটের সামনে পুলিশের সাথে এ বিষয়ে বাকবিতন্ডা হয় জেলা রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি ও এশিয়ান টিভির জেলা প্রতিনিধি হুমায়ুন কবীর রিন্টুর সাথে।

এখানেই শেষ নয়, ৮মে জরুরী সংবাদ সংগ্রহের জন্য যাচ্ছিলেন নড়াইল প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমাদের সময় জেলা প্রতিনিধি এনামুল কবীর টুকু ও এনটিভির জেলা প্রতিনিধি মুনীর চৌধুরী। নিশিনাথ তলা এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাহিদ হাসান তাদের আটকিয়ে হেলমেট এর প্রসঙ্গে হেনস্থা করেন।
নড়াইল প্রেস ক্লাবের সভাপতি এনামুল কবীর টুক ুবলেন, করোনার সময় ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকরা কাজ করেন। এরপর হেলমেট পরা একট ুকষ্টকর। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনাকারী ম্যাজিষ্ট্রেট জাহিদ হাসান যে ব্যবহার করছেন তা অত্যন্ত অবমাননাকর। মনে হয় সাংবাদিকদের ওপর তারা কোন প্রতিশোধ নিচ্ছেন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসককেও অবগত করা হয়েছে। ৬মে ধোপাখোলা মোড়ে এক হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছে গাজী টিভি’র জেলা প্রতিনিধি মীর্জা মাহামুদ হোসেন রন্টুকে। ম্যাজিস্ট্রেট আশিক তার কোন ওজোর আপত্তি শুনেননি। অথচ, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনাকারী ম্যাজিষ্ট্রেট জাহিদ এর সামনে দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ নম্বরপ্লেট ও হেলমেটবিহীনভাবে মটরসাইকেল চালালেও তাদেরকে জিজ্ঞাসাও করছেননা।

ভূক্তভোগী গণমাধ্যম কর্মীরা এ ব্যাপারে কয়েক দফা সভা করে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, ৩ মে মাইজপাড়া বাজারে ভ্রাম্যমান আদালতের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের অভিযোগে সংবাদ সংগ্রহ করতে যায় স্থানীয় সাংবাদিকেরা। ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ইজিবাইক চালকের মাথার চুল কাটা, কৃষকের হাত ভেঙ্গে দেয়া, আদালতের দ্বায়িত্বরত পুলিশের মার খেয়ে কয়েক ব্যবসায়ীর শরীরে আঘাতের চিহ্নের ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় কয়েকটি দৈনিক ও অনলাইনে। ভ্রাম্যমান আদালতের মার খাওয়া একজনকে ডিসি অফিসে গোপনে ডেকে আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রাখা হয়। এর পর থেকেই মুলতঃ ভ্রাম্যমান আদালতের খড়গ নেমে আসে গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর। উল্টো “সাংবাদিকরা বানিয়ে সংবাদ প্রচার করেছে” এমন অভিযোগ দাড় করিয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের শায়েস্তা করতেই মাঠে ভ্রাম্যমান আদালত।

করোনার দূর্দিনে প্রথম সারির যোদ্ধা সাংবাদিকদের প্রতিশোধমূলক হেনস্থা করার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন দৈনিক ওশানের সম্পাদক এড. আলমগীর সিদ্দিকী, নড়াইল বার্তা সম্পাদক এড. হাফিজুর রহমান খোকন, নড়াইল কন্ঠ সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান, বিডি খবর সম্পাদক লিটন দত্ত, দৈনিক নড়াইল প্রতিদিন সম্পাদক শরীফুল ইসলাম বাবলু, নড়াইল প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি ও নড়াইল বার্তা ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ নাইমুর রহমান ফিরোজসহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
দৈনিক ওশানের সম্পাদক এড. আলমগীর সিদ্দিকী বলেন, গণমাধ্যম মানুষের কষ্টের কথা লিখবে এটাই স্বাভাবিক। জনপ্রশাসন যদি সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালায় তবে দায় তাদের। এই অযুহাতে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিহিংসামূলক হেনস্তা করা দুঃখজনক।
গণমাধ্যমকর্মীদের সায়েস্তা করতে মাঠে নামা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নড়াইল জেলা প্রশাসনে সদ্য যোগদানকারী এনডিসি (নেজারত ডেপুটি কালেক্টর) হিসেবে কর্মরত। নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মো. জাহিদ হাসান মোবাইল কোর্টে সাংবাদিকদের টার্গেট করার কথা অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগ তীব্র নিন্দার সাথে প্রত্যাখ্যান করছি।

অভিযোগ বিষয়ে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, মোবাইল কোর্টের বিষয়গুলো আপনারা অন্যভাবে নিলে আমরা ভ্রাম্যামান আদালত পরিচালনা করবোনা। মাইজপাড়ার ঘটনার ব্যাপারে আমি আমাদের ম্যাজিষ্ট্রেটদের কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছি। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাংবাদিক কেন কারো ব্যক্তিস্বার্থ ক্ষুন্ন হয় সেটা আমাদের কাম্য নয়।
অপরদিকে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপিত সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলে মোবাইল কোর্টের এসব কর্মকান্ড প্রমানিত হয়ে যাবে বলে সাংবাদিক মহলের দাবি।

Comments (0)

Your email address will not be published. Required fields are marked *