জাল-জালিয়াতিতে তিন কোটি টাকার জমি রেজিস্ট্রি,সাব-রেজিস্ট্রারসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নিউজটি শেয়ার লাইক দিন

বিশেষ প্রতিবেদক, যশোর: জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তিন কোটি টাকার জমি রেজিস্ট্রিশন করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার যশোর সদর সাব-রেজিস্ট্রার আমেনা বেগমসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন আইনে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। যশোর শহরের ঘোপ জেল রোডের ৬ শতক জমি জাল দলিলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১লা অক্টোবর) শহরের ঘোপ জেল রোডের ফজলে আকবরের ছেলে ফজলে রাব্বী বাদী হয়ে এ মামলা করেন। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা বেগম অভিযোগটি তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাদীর আইনজীবী দেবাশীষ দাস।

আসামিরা হলেন, যশোর সদর সাব-রেজিস্ট্রার আমেনা বেগম, শহরের ঘোপ জেল রোডের মৃত হারুন-অর-রশীদের ছেলে মোশারফ হোসেন, উপশহর ৭ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা মাওলানা জুলফিকার আলীর স্ত্রী ফজলিয়ারা খাতুন, ঘোপ জেল রোডের মৃত আলহাজ গোলাম রব্বানীর ছেলে দলিলের সাক্ষী ফকরুল কবির বুলবুল, সদরের সুজলপুরের মৃত জনাব আলীর ছেলে দলিলের সাক্ষী মহসিন, উপশহর ১ নম্বর সেক্টরের মোশারফ হোসেনের ছেলে দলিলের সাক্ষী জামাল হোসেন, ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের মৃত মুজিবর রহমানের ছেলে দলিল শনাক্তকারী ওমর ফারুক সাগর এবং পাগলাদাহ গ্রামের দলিল লেখক কাজী রুহুল কুদ্দুস।

মামলার অভিযোগে বাদী উল্লেখ করেন, আসামি মোশারফ হোসেন দীর্ঘদিন ফজলে রাব্বীর বাড়ির কেয়ারটেকার ছিলেন। ফজলে রাব্বীর পিতা ফজলে আকবর ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর যশোর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১৪২৯৯ নম্বর দলিলের মাধ্যমে আরএস ১৭৭০ দাগসহ বিভিন্ন দাগের মোট ৮২ দশমিক ৪৫ শতক জমি রেজিস্ট্রি করেন। পরে বাদী নিজের নামে নামজারি করে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে আসছেন। ওই জমির মধ্যে ছয় শতক জমি নিয়ে মোশারফ হোসেন ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর ১৪২৭৪ নম্বর একটি জাল কবলা দলিল তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে ওই দলিলের ভিত্তিতে নামজারির উদ্যোগ নেন তিনি। বিষয়টি জানতে পেরে ফজলে রাব্বী দেওয়ানি মামলা দায়ের করলে ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট আদালত তার পক্ষে একতরফা আদেশ দেন। ওই আদেশে বিরোধপূর্ণ জমিতে উচ্ছেদ, মাটি কাটা, স্থাপনা নির্মাণ, হস্তান্তর কিংবা জমির প্রকৃতি পরিবর্তনের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই আপিল আদালতও আগের আদেশ বহাল রাখেন।

ফজলে রাব্বীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) ২০২৩ সালের ২৬ জুলাই বিরোধপূর্ণ ছয় শতক জমির নামজারি-সংক্রান্ত ১১৪৩৮/৯-১/২০২০-২১ নম্বর মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। এরপরও আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে জাল ডিসিআর তৈরি ও ব্যবহার করে জমিটি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ৬ আগস্ট যশোর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১০৫৬৩/২০২৫ নম্বর সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। এতে ছয় শতক জমির বিক্রয়মূল্য তিন কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় সাব-রেজিস্ট্রার আমেনা বেগমসহ অন্য আসামিরা জাল দলিল সম্পাদন, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।

ফজলে রাব্বী খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই করা ডিসিআরের কোনো অস্তিত্ব নেই। ভুয়া ডিসিআর ব্যবহার করে দলিল রেজিস্ট্রি এবং জমির প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কম মূল্য দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব ও ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসামিরা দুর্নীতির অপরাধ করেছেন এমন অভিযোগ এনে তিনি আদালতে এ মামলা করেন। আলোচিত এই জমির জাল-জালিয়াতি নিয়ে ইতোপূর্বে একাধিক বার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

 

উল্লেখ্য সাব রেজিস্টার আমিনা বেগম ঝিনাইদাহে থাকাকালীন সময়ে নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি মন্ত্রণালয় জানার পরে ২০২২ সালের ১ লা ডিসেম্বরে তাকে জরুরি চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

সেই সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার আমিনা বেগম অবৈধ অর্থ আদায় ও দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠে। তার দাপ্তরিক কাজে বেপরোয়া অনিয়মের কারনে জনমনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। তার আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে বিদ্যমান জনশ্রুতি এবং ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ থাকায় সুনির্দিষ্ট কর্মকান্ডে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিব্রত বোধ প্রকাশ করেন।

সেই সময়ে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক ও খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের এক চিঠির সূত্রে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দুরীকরণ এবং মাঠ প্রশাসনের ভাবমুর্তি সমুন্নত রাখতে তাকে প্রত্যাহার করে তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান। আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে লেখা চিঠিতে তিনি এই সুপারিশ করেন।

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মনিরা বেগম স্বাক্ষরিত চিঠিতে আরো বলা হয়েছিলো, ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার আমিনা বেগমের বিরুদ্ধে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভুক্তভোগী জনগণ প্রতিনিয়ত মৌখিক ও লিখিতভাবে অভিযোগ করে চলেছেন। এ বিষয়ে একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগও পাওয়া যায়। অভিযোগের মূল উপজীব্য সাব-রেজিস্ট্রার আমিনা বেগম কর্তৃক সরকার নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত আদায় ও ঘুষ-দুর্নীতি।

সূত্রে উল্লিখিত অভিযোগসমূহ পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি দীর্ঘদিন যাবত ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার পদে কর্মরত আছেন। যে কোনো জমি ক্রয় বিক্রয়ে সম্পাদিত দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় আমিনা বেগম সরকারি প্রাপ্য অর্থ বাদেও লক্ষ লক্ষ টাকা (দলিল বুঝে) অতিরিক্ত গ্রহণ করছেন এবং সেবা প্রত্যাশী জনগণ অনোন্যপায় হয়ে এই অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি তার অফিসে এইসব অনৈতিক কাজ করার স্বার্থে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তুলেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তিনি সাধারণ লোকের নিকট থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন, কিন্তু ভিআইপিদের নিকট থেকে সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি নেন না। এটা তার একটি পলিসি। দলিলের নকল উত্তোলনের সময় সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকারি ফির দ্বিগুণ টাকা নিতেন। অতিরিক্ত টাকা না দিলে সেবা প্রত্যাশীদেরকে বিভিন্নভাবে দলিল লেখক সমিতির নামে গঠিত সিন্ডিকেট দিয়ে হয়রানি করা হয়। দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় কাগজপত্রে বা অন্য কোনো ত্রুটি থাকলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তা সহজেই রেজিস্ট্রেশন করে দেয়া হত। কিন্তু কাগজপত্র সঠিক হওয়া সত্ত্বেও ঘুষ দুর্নীতির কবলে পড়ে নিষ্পেষণের শিকার হন কৃষক ও সাধারণ শ্রেণির মানুষ।

 

অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে হেবা দলিলের ক্ষেত্রে তিনি অনৈতিকভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করছেন। উইলের দলিল যথাযথভাবে প্রবেট হওয়া সত্ত্বেও অন্যকে দলিল করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত খতিয়ানে যে শ্রেণি বিদ্যমান তা পরিবর্তন করে তিনি অহরহ দলিল সম্পাদন করে দিচ্ছেন। অবৈধ দলিল লেখক সমিতি এবং তার এহেন দৌরাত্মে এলাকার সাধারণ জনগণ নাজেহাল হচ্ছেন।

 

জেলা এসএমই ঋণ বিতরণ মনিটরিং কমিটির সভা, জেলা রাজস্ব সভায় সাব-রেজিস্ট্রার আমিনা বেগমের বিরুদ্ধে অহরহ অভিযোগ উত্থাপিত হতো। জেলা এসএমই ঋণ বিতরণ মনিটরিং কমিটির সভায় বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাগণ অভিযোগ করেন যে, ঋণগ্রহীতারা বন্ধকী দলিল করতে গেলেও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে উক্ত দলিল রেজিস্ট্রি করতে হত।

 

একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ জনমনে সৃষ্টি হওয়া কাম্য নয়। একজন কর্মকর্তার এরূপ আইন ও নৈতিকতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে জেলার সরকারি অফিস সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরি হচ্ছে, সাধারণ জনগণের নিকট ভূমি সংক্রান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। সাব-রেজিস্ট্রার সরাসরি জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে না থাকায় নিম্নস্বাক্ষরকারীর নিকট ব্যাপক অভিযোগ আসা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ, ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে বিদ্যমান জনশ্রুতি এবং ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ থাকায় তার এহেন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে তদন্ত হওয়া অত্যাবশ্যক। উক্ত কর্মকর্তার এরূপ কর্মকান্ড বন্ধ করে সাধারণ জনমানুষের ভোগান্তি লাঘব, সামাজিক বিশৃঙ্খলা দূরীকরণ এবং মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার প্রয়াসে জনাব আমিনা বেগমকে বিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রারের পদ হতে প্রত্যাহার পূর্বক একজন সৎ কর্মকর্তা পদায়ন এবং তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হলো।

 

Comments (0)

Your email address will not be published. Required fields are marked *