ধোনির মাছের ঘেরে কৃষের সর্বনাশ

নিউজটি শেয়ার লাইক দিন

 তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর প্রতিবেদক: যশোরে ধোনির মাছের ঘের এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে একসময় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ফলতো সোনালি ফসল।

সেই বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে তৈরি করা হয়েছে, মাছের ঘের আর মাছের ঘের। ফলে পানি নিকাশনের পথ গুলো সবই বন্ধ হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এখন সারা বছর পানি থইথই করেছে। যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর এই তিন উপজেলা ভবদহ অঞ্চল। এ অঞ্চলটিকে যশোরের দুঃখও বলা হয়ে থাকে। তিন উপজেলা মিলে প্রায় ৫০ হাজার কৃষক রয়েছেন। যাদের কয়েক পুরুষ মিলে কৃষি কাজের উপরেই নির্ভরশীল। কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের তথ্যমতে, অতি বৃষ্টির পানি নিকাশন না হওয়ার কারণে এই অঞ্চলের কৃষকরা প্রতিবছর প্রায় ২৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের সংকটে পড়েন। অথচ একসময় পরম মমতায় এসব জমিতে সোনা ফলাতেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। সেই ফসলই ছিল তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। তবে বর্তমান চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। কিছু ধোনি মৎস্য চাষীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন ৫০ হাজারের অধিক কৃষক।

মনিরামপুর সুন্দলী গ্রামের জিতেন্দ্রনাথ দত্ত বলেন, তাদের বাপ দাদারা কয়েক শতাব্দি ধরে এ বিলে ফসল চাষ করে আসছে। এই বিলেই তার ও আছে চার বিঘা জমি। বছর দশেক আগেও এই জমিতে সোনার ফসল ফলাতেন তিনি। তবে সেই জমি এখন রূপ নিয়েছে জলাভূমিতে। ধোনী মৎস্য খামারিদের খামার অব্যবস্থাপনার কারণে এলাকায় এখন জলবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। যেখানে সেখানে তৈরি করা হয়েছে মৎস্য খামার। যে কারণে পানি প্রবাহের খাল গুলো সব বন্ধ হয়ে গিয়ে পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

অভয়নগর ধোপাদী গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, তার কৃষিজমির পাশেই গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি মাছের ঘের। অনুমোদনহীন এসব ঘেরের কারণেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে জমিতে। একসময় এই জমিতে তিন ফসল ফলতো। ঘের হওয়ার পর আস্তে আস্তে জলাবদ্ধতা শুরু হয়। বর্ষা মৌসুম আসলেই কোথাও কোমর পানি, কোথাও গলা পানি। এখন আশেপাশের কোথাও কোন ফসল উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

কেশবপুরের বলধালী গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, গত দুই যুগ ধরে মাঠ জুড়ে প্রভাবশালী মৎস্য খামারীরা কোন ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিক্ষিপ্তভাবে মাছের ঘের তৈরি করেছেন। এর ফলে পানি নিকাশন হতে না পেরে মাঠ জুড়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ঘের ব্যবসায়ীদের কিছু বলতে গেলে তারা সাধারণ কৃষকদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেয়। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনকেও জানালেও কোন লাভ হয়নি বলে তিনি জানান।

সরকারী তথ্য ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ভবদহ অঞ্চলে প্রায় ১৮ হাজার ২৪০টি মাছের ঘের আছে। এই অঞ্চলের ছোট-বড় প্রায় ৫২টি বিলের মোট ১২ হাজার ৯৮৬ হেক্টর জমিতে এই ঘেরগুলো গড়ে উঠেছে।

শনিবার ও রোববার অভয়নগর মনিরামপুর কেশবপুর সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অঞ্চল গুলোর ফসলের মাঠের কৃষিজমির বুক চিরে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত বিশাল মাছের ঘের। মাছের ঘেরের কারণে পুরো অঞ্চল জলবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ঘের স্থাপনে শতভাগ জমিমালিকের সম্মতি এবং পানি নিষ্কাশনের পথ উন্মুক্ত রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রভাবশালী ঘের ব্যবসায়ীরা তার কিছুই মানেননি। ফলে ধনী মৎস্য খামারীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের কৃষকরা।

এ অঞ্চলের সুশীল নাগরিকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যা নিয়ে উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর এবং কৃষি অধিদপ্তরসহ একাধিক জায়গায় অভিযোগ করেও কোনো সমাধান মেলেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েক দফা তদন্ত করে কৃষকদের পক্ষে রায় দিলেও সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে ঘেরের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে এই অঞ্চলের কৃষকের দুর্দশাও।

 

তবে মৎস্য খামারীরা বলেছেন ভিন্ন কথা, ‘মণিরামপুর, কেশবপুর এবং অভয়নগর অঞ্চলে মাছের ঘেরের বিষয়গুলো বাস্তব সত্য। এই ঘেরগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তাই প্রশাসনকে দুটি বিষয়ই একসাথে দেখতে হচ্ছে। মৎস্যজীবী এবং কৃষিজীবী- উভয়েই আমাদের পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলছেন সব স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বসে খুব শিগগির একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছাবে।

 

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, যশোর মণিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর ভবদাহ অঞ্চলে সাধারণত প্রায় ২৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর (প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর) জমিতে বোরো ধানের আবাদ হতো। জলবদ্ধতার কারণে এসব ফসল হয় না বললেই চলে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরের সাথে সমন্বয় চলছে। জলাবদ্ধতা নিরাশন করে এ অঞ্চলে ফসল উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণের কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছে। তবে পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপরে বর্তায় বলে জানান এ কর্মকর্তা।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভবদাহ অঞ্চলে অনুমোদিত মাছের ঘেরের সংখ্যা থেকে অপরিকল্পিত অনানুমোদিত ঘেরের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে এলাকায় জলবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এরমধ্যে অভয়নগরে মোট মাছের ঘেরের সংখ্যা ৬৪০০টি। এর মধ্যে অনুমোদিত মাত্র ৩৪টি মাছের ঘের, মনিরামপুর উপজেলায় মোট ঘেরের সংখ্যা ২৬৩৯টি। এরমধ্যে অনুমোদিত সংখ্যা নেই। কেশবপুরে মোট ঘেরের সংখ্যা  ৪০৪২টি। এর মধ্যে অনুমোদিত ঘেরের সংখ্যা ১০৪টি। অর্থাৎ ১৩ হাজার ৮১টি মাছের ঘেরের মধ্যে মাত্র ১৩৮ টি ঘের অনুমোদিত। বাকিগুলো অপরিকল্পিত বিক্ষিপ্তভাবে যেখানে সেখানে তৈরি হয়েছে।কিন্তু বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের মিটিং এ ও তোলা হচ্ছে। কিন্তু তেমন কোন সুরাও হচ্ছে না। যার ফলে ভবদাহ অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের কর্মকর্তা প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে ভবদহ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের জন্য জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অপরিকল্পিত মাছের ঘেরের বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে ও আলোচনা হয়েছে।

 

উল্লেখ্য বিভিন্ন গবেষণাপত্র ও স্থানীয় কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, ভবদাহ অঞ্চলের ৫২টি ছোট-বড় বিলের স্থায়ী ও সাময়িক জলাবদ্ধতার কারণে বছরে প্রায় ২ লাখ থেকে ২.৫ লাখ টন (বা তার বেশি) খাদ্যশস্য ও কৃষি ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। মূলত আমন ও বোরো মৌসুমে জমি তলিয়ে থাকায় কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতে পারেন না

Comments (0)

Your email address will not be published. Required fields are marked *