তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর : দেশে কয়েক দফায় অবরোধ-হরতালে যশোরের ঝিকরগাছার ফুল চাষিরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছে প্রতিদিন এ ফুলের বাজারে অন্ততপক্ষে ১০ লাখ টাকার লোকসান হচ্ছে।
বিএনপি-জামাতের ডাকা লাগাতর এ আন্দোলনে অধিকাংশ দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ থাকায় ঢাকা সহ দেশের প্রত্যন্ত জেলাগুলোতে ফুল সরবরাহ না করতে পারায় কৃষক ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বুধবার সকালে ফুলের রাজধানী নামে খ্যাত ঝিকরগাছার পানিসারা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ৫ টাকার গোলাপ এখন পঞ্চাশ পয়সা থেকে ১টাকা বিক্রি হচ্ছে, ৮ থেকে ১১ টাকার জারবেরা এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ টাকায়, রজনীগন্ধার প্রতিটি স্টিক বিক্রি হচ্ছে দেড় থেকে দুই টাকায়। অথচ রজনীগন্ধার একটি স্টিক অবরোধ হারতালার আগে তিন থেকে পাঁচ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ফলে প্রতিদিন ঝিকরগাছার গদখালীতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা কয়েক লাখ টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঝিকরগাছা উপজেলায় ৬২০ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ৫৬ জন কৃষক ফুল চাষাবাদ করেছেন। এসব ফুলের মধ্যে গোলাপ ১১৯, গাঁদা ফুল ১৪০, রজনীগন্ধা ১৫৫, গ্লাডিয়াস ১৭৫, জারবেরা ২০, রথ স্টিক ১.৪৮, চন্দ্রমল্লিকা ৫, জিপসি ০.০২, লিলিয়াম ২.৫০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষাবাদ করেছেন। এ পর্যন্ত কৃষক ৪১ কোটি ৯৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা ফুল বিক্রি করেছেন।
ঝিকরগাছা গদখালী নিমতলা এলাকার ফুলচাষী হাসান বলেন, তিনি এক বিঘা গোলাপ ফুল চাষ করছেন। এ ফুল চাষ করতে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রথম বছর জানুয়ারী আর ফেব্রুয়ারী মাসের যে ফুল বিক্রি করা হয়, তাতে খরচের টাকা উঠে যায়। এরপর সারা বছর যে ফুলটা বিক্রি হয়, সেটা কৃষকের লাভ। তবে এবছর হরতাল অবরোধের কারণে লাভ তো দূরের কথা ফুল বিক্রি করে খরচের টাকাও উঠবে না বলে জানান।
ঝিকরগাছা পানিসারার ফুল চাষী ইসমাইল হোসেন বলেন, নিজের আড়াই বিঘা জমি আছে। আরো তিন বিঘা জমি লিজ নিয়েছেন। সব মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে এ বছর ফুল চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা বিশ হাজার টাকা দরে অন্যের জমি লিজ নিয়ে ফুল চাষ করেছেন। তবে অন্যান্য বার মোটামুটি ফুলের দাম থাকায় খরচ-খরচা বাদে কিছু লাভ হয়েছিলো। তা দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে কোন ভাবে চলছিল। কিন্তু এবার অবরোধ-হরতালে ফুলের দাম একেবারেই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অধিকাংশ ফুল চাষিরা বর্তমানে ফুলের বাজার দেখে হতাশ গ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অনেকে আবার ফুলের বাগান ভেঙ্গে দিয়ে অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ করতে শুরু করেছেন। যদি এই অবস্থা চলতে থাকে তাহলে যারা অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করছেন তারা লিজের টাকা না দিতে পারলে এলাকা ছেড়ে পালাতে হবে বলে জানান।

পানিসারার ফুল ব্যবসায়ী সাকিব বলেন, আজ প্রতিটি জারবেরা ফুল বিক্রি হচ্ছে তিন টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭ টাকা, হরতালের পূর্বে এই ফুলের দাম ছিল ৮ টাকা থেকে ১২ টাকা, আবার একই ফুল ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে প্রতিটি বিক্রি হয়ে থাকে ১৫ থেকে ১৮ টাকা। বর্তমানে প্রতিটি গোলাপ ১ টাকা থেকে দেড় টাকা বিক্রি করা হচ্ছে, ১৪ই ফেব্রুয়ারী ও একুশে ফেব্রুয়ারী প্রতিটি গোলাপ বিক্রি হয় ৭ টাকা থেকে ২০ টাকা। প্রতিটি রজনীগন্ধা বিক্রি করা হচ্ছে তিন টাকা থেকে ৫ টাকা, যেটা পূর্বে বিক্রি হত ৬ টাকা থেকে ৮ টাকা, গাঁদা ফুল প্রতি হাজার ৭০ টাকা থেকে ১০০ টাকা, অথচ হরতালের পূর্বে প্রতি হাজার গাধা ফুল দেড়শ টাকা থেকে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হতো। হরতাল অবরোধ কারণে ফুল ঢাকা নিতে না পারায় এমন অবস্থা হয়েছে। তাছাড়া স্থানীয় দর্শনার্থীরা এখানে আসতে পারছে না। যে কারণে খুচরা পর্যায়েও ফুল বেচা বিক্রি একেবারেই নাই বললেই চলে।
পানিসারা বাজারের খুচরা ফুল ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী বলেন, যেখানে আগে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা ফুল বিক্রি হত। এখন সেখানে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১০০ টাকা ফুল বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ ফুল বিক্রি করতে না পারায় ফুল পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফুলের রাজধানী নামে খ্যাত গদখালীর পানিসারাতে প্রতিদিন যশোর সহ আশপাশের জেলা থেকে চার থেকে পাঁচ হাজার দর্শনার্থী আসতো। এখন অবরোধ-হরতাল থাকায় বাইরে থেকে কোন দর্শনার্থীই আসছে না। আশপাশের এলাকা থেকে যা লোকজন আসছে তাদের কাছে সারাদিনে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত ফুল বিক্রি হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই অনেক টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এই ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় যাওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকবেনা বলে জানান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

ঝিকরগাছার ফুল চাষী কল্যাণ ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শের আলী সরদার বলেন, অবরোধ-হরতালের কারণে প্রতিদিন ঝিকরগাছার গদখালীর ফুল চাষী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই তিনি কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে দ্রুত অবরোধ হরতাল তুলে নেয়ার ও দাবি জানান।
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসাইন পলাশ বলেন, আমরা কৃষকদের সার,বীজ ও নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। তবে অবরোধ-হরতালের কারণে কৃষক ফুল বিক্রি করতে পারছে না। অনেক কৃষক ফুল গাছ তুলেও ফেলছে। এ অবস্থা দীর্ঘ সময় থাকলে আগামীতে ফুল চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে কৃষক।